কম জন্মহার ও বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে জাপানের লজিস্টিক খাত হয়ে উঠেছে রোবোটিকসের সর্বশেষ আবিষ্কারের পরীক্ষা ক্ষেত্র। শ্রম সংকট নিরসন ও দ্রুত পণ্য সরবরাহ বজায় রাখতে অনেক কোম্পানি রোবটের দিকে ঝুঁকছে। তবে জাপানে এ খাতের বেশির ভাগ অংশ এখনো অ্যামাজনের মতো রোবট ব্যবহারের দিকে এগোতে পারেনি। খবর এফটি।
টোকিওর কাছাকাছি চিবা এলাকায় রয়েছে অ্যামাজনের ফুলফিলমেন্ট সেন্টার, যেখানে পণ্য সংগ্রহ, প্যাকেজিং ও ডেলিভারি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কেন্দ্রটিতে দুই হাজার কর্মীর তুলনায় রোবটের সংখ্যা বেশি এখন। সাধারণ গোডাউনের তুলনায় এর ধারণক্ষমতা ৪০ শতাংশ বেশি। অ্যামাজন আকার অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে পণ্য সাজাতে এখানে নতুন একটি যন্ত্র ব্যবহার করছে। এছাড়া জটিল সর্টিং সিস্টেমের মাধ্যমে একাধিক পণ্য একসঙ্গে এক বাক্স বা ব্যাগে প্যাক করছে কোম্পানিটি।
তবে ঝামেলা দেখা দেয় এ প্যাকেজ ডেলিভারির সময়। কারণ জাপানের প্রায় ৩০ শতাংশ নাগরিকের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। এর প্রভাবে দেশটিতে কমছে ট্রাকচালক। নোমুরা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এনআরআই) পূর্বাভাস অনুসারে, ২০৩০ সাল নাগাদ ট্রাকচালক এক-তৃতীয়াংশ কমে হবে ৪ লাখ ৮০ হাজার।
তবে অ্যামাজন জাপানের অপারেশনস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট কোহেই শিমাতানি বলেছেন, ‘রোবটিকস শুধু ফুলফিলমেন্ট সেন্টারে সীমাবদ্ধ থাকছে না। ছোট ডেলিভারি হাবে স্বয়ংক্রিয় প্যাকিং সক্ষমতা চালুর সম্ভাবনাও রয়েছে। জাপানের দ্রুত হ্রাসমান কর্মক্ষম বয়সী জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি।’
অ্যামাজন যতটা প্রযুক্তির ওপর আস্থাশীল, তার তুলনায় শ্রম সংকট নিরসনে পিছিয়ে রয়েছে জাপানের লজিস্টিক খাতের প্রতিদ্বন্দ্বীরা। বিশেষ করে যাদের গ্রাহক চাহিদা ও পণ্যের বৈচিত্র্য অনেক বেশি, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা সমাধান কঠিন হয়ে পড়ছে।
পূর্ব টোকিওর গুদামে সম্প্রতি চালকবিহীন একাধিক প্রযুক্তি পরীক্ষা শুরু করেছে নিপ্পন এক্সপ্রেস। কিন্তু উচ্চ প্রযুক্তির ওপর বিনিয়োগ থেকে কতটা রিটার্ন আসবে, তা নিয়ে নিশ্চিত নন কোম্পানির নির্বাহীরা।
নিপ্পন এক্সপ্রেসের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের নির্বাহী আকিরা উনো বলেন, ‘আমরা যদি শুধু কোনো কাজকে প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করার কথা বলি, তাহলে এর কার্যকারিতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। এসব প্রযুক্তির বেশির ভাগই এখনো প্রদর্শনী পর্যায়ে আছে। এটি একটি পরিবর্তনের সময়, যেখানে দেখা যাবে প্রযুক্তি দ্রুত উন্নতি করবে নাকি মানুষই ভালো।’
বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি জাপান সর্বাধিক শিল্প রোবট সরবরাহকারী দেশ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু অ্যামাজনবহির্ভূত কোম্পানিগুলোর গুদামের প্রতি ইউনিটে মাত্র দশমিক ১৭টি রোবট রয়েছে। ইন্টার্যাক্ট অ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিট প্রতি দশমিক ৬৮ ও চীনে দশমিক ৫৭টি রোবোট ব্যবহার হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জাপানের লজিস্টিক রোবট গ্রহণে ধীরগতির কারণ হলো কঠোর পরিশ্রমী কর্মী, শহরকেন্দ্রিক ঘনত্ব ও অনলাইন শপিংয়ের ধীর প্রবাহ। এছাড়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির কারণে ছোট গুদাম, এল আকৃতি ও বহুতলে বিস্তৃত হওয়ায় রোবট সিস্টেম একীভূত করা কঠিন।
টোকিওভিত্তিক লজিস্টিক কনসালট্যান্ট রোইচি কাকুই বলেন, ‘গুদামে রোবট বসানোর ধীরগতির মূল কারণ হলো খরচ।’
গত বছর ‘২০২৪ প্রব্লেম’ নামে নতুন আইন ঘিরে জাপানে উদ্বেগ দেখা যায়। এ আইন ট্রাক চালকদের কাজের সময় নির্দিষ্ট করে দেয়। এছাড়া দেশটিতে প্রতি বছর ১০ হাজার ট্রাক চালক কাজে ছেড়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে লজিস্টিক খাতের নির্বাহীদের আশঙ্কা, জাপান ই-কমার্সের হঠাৎ বৃদ্ধিকে সামলাতে পারবেন না তারা। যদিও এর আকার এখনো খুচরা বিক্রির ১০ শতাংশের কম। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে মোট খুচরা বিক্রির ২৭ শতাংশ ই-কমার্সনির্ভর।
এমন পরিস্থিতিতে নিপ্পন এক্সপ্রেস ও অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য রোবট প্রবর্তনের হিসাব শুধু খরচের বিবেচনায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, কর্মী সংকটের মাঝে তারা কীভাবে সরবরাহ চেইন বজায় রাখবে।